মামলা মোকদ্দমায় জ্যোতিষীয় সূত্র

প্রফেসর ডক্টর কুশল সেন

অধ্যাপক (ফলিত সংখ্যাতত্ত্ব), Astrological Research Institute of Krishnamurti Paddhati (ARIKP)

সদস্য, মার্গদর্শক মন্ডল, ভারতীয় বৈদিক জ্যোতিষ সংস্থানম্‌, বারানসী

e-mail :  kooshoeg@gmail.com

সনাতন, জ্যোতিষশাস্ত্রে , মামলা-মোকদ্দমা বিচারের ক্ষেত্রে, ষষ্ঠভাব বা ষষ্ঠভাবপতি এর সংযোগী ভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লগ্ন বা জন্মরাশি সাপেক্ষে, ৬ষ্ঠ গৃহের নামকরণে রিপুস্থান, ঋণস্থান, দুঃস্থান এবং জন্মস্থান বলে অভিহিত করা হয়। ষষ্ঠ গৃহের কারকগ্রহ মঙ্গল, যাকে নৈসর্গিক অশুভগ্রহ বলে গণ্য করা হয়। ষষ্ঠ গৃহ থেকে মুখ্য শত্রুতা, আবার ষষ্ঠ গৃহের ষষ্ঠভাব একাদশ গৃহ থেকে লাভালাভ এবং ষষ্ঠ গৃহের ৭মভাব দ্বাদশ গৃহ থেকে গুপ্ত শত্রু ও মানসিক অশান্তি বিচার্য। সপ্তম ভাব বা ভাবপতি থেকে জাতকের বিরুদ্ধ শক্তি বা বিরুদ্ধ ব্যক্তির বিষয়ের বিচার হয়। আবার ষষ্ঠগৃহের (ঋণস্থান) অধিপতিগ্রহ ও কারকগ্রহ মঙ্গল যদি সবল হয় এবং দ্বাদশগৃহ (ব্যয়স্থান, মানসিক অশান্তি) যদি নৈসর্গিক পাপগ্রহ (শনি/মঙ্গল/রাহু/রবি/বলহীন চন্দ্র) যুক্ত না হয় বা দৃষ্ট না হয় তাহলে জাতক ঋণশোধ করতে সক্ষম হবে অন্যথায় ঋণসংক্রান্ত মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়বে।

মামলা-মোকদ্দমা হওয়ার সম্ভাব্য সংযোগ : –  মামলা-মোকদ্দমা হওয়ার ক্ষেত্রে সনাতন বৈদিক জ্যোতিষে; কয়েকটি প্রামাণ্য সূত্র রয়েছে –

(১) যে কয়েকটি জাতলগ্নের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ এবং সপ্তমপতি স্থির গ্রহ, সেই লগ্নগুলির ক্ষেত্রে স্থিরগ্রহগুলি যদি স্থিররাশিতে অবস্থান করে তাহলে মামলা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

(২) ষষ্ঠভাব বা ভাবপতি এবং সপ্তমভাব বা ভাবপতির সঙ্গে যদি লগ্নভাব বা ভাবপতির সংযোগ থাকে তাহলে জাতক-জাতিকা অবশ্যই মামলা-মোকদ্দমার শিকার হবে, (অর্থাৎ লগ্ন/লগ্নভাব+ষষ্ঠভাব/ভাবপতি+৭মভাব/ভাবপতি)।

(৩) উপরোক্ত সূত্র সাপেক্ষে বলা যায়, যদি অষ্টমভাব বা ভাবপতি, দ্বাদশ ভাব বা ভাবপতি সংযুক্ত হলে মামলা মোকদ্দমা হেতু ঝামেলা ঝঞ্ঝাট বৃদ্ধি পাবে। (অর্থাৎ লগ্ন/লগ্নভাব+৬ষ্ঠভাব/ভাবপতি+৭মভাব/ভাবপতি+৮মভাব/ভাবপতি+১২শভাব/ভাবপতি=মামলা-মোকদ্দমা হেতু ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট বৃদ্ধি)

(৪) শনি, মঙ্গল, রাহু যদি একত্রে ৬ষ্ঠ/৮ম অথবা ১২শ ভাবে অবস্থিত হয় তাহলে আইনগত বিবাদ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

(৫) জাতক-জাতিকার জন্মলগ্নের সাপেক্ষে ধনপতি (২য় পতি), আয়ভাবাধিপতি (১১) পতি) গ্রহ ষষ্ঠ, অষ্টম অথবা ব্যয়ভাবগত হলে মামলা মোকদ্দমার জন্য রাজদন্ড হবে।

(৬) ধনপতি (২য় পতি) রবিযুক্ত হয়ে ১২শ ভাবে বা নীচস্থ বা পাপগ্রহ দৃষ্ট হলে আইনগত বিবাদ হবে।

(৭) ৩য় পতি ও ৬ষ্ঠ পতি অশুভভাবে অথবা বুধ নীচস্থ হলে, ভ্রাতা-ভগ্নীর সাথে মামলা-মোকদ্দমা হবে।

(৮)অষ্টম স্থানে একাধিক পাপগ্রহ থাকলে জাতক গুপ্তশত্রু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে, আইনগত বিবাদ হওয়ার প্রবল যোগ হবে।

(৯) জাতচক্রে কেতু ও বৃহস্পতি অষ্টমে থাকলে দেবোত্তর সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমা হবে।

(১০) ১০ম পতি শনি নীচস্থ হয়ে জাতচক্রে রবির সাথে ৭ম স্থানে অবস্থিত হলে নিজের কর্মকর্তার সাথে মামলা-মোকদ্দমা হওয়ার ভয় থাকবে।

মামলা-মোকদ্দমায় জয়লাভ –  লগ্নভাব, ষষ্ঠভাব, ৭ম ভাবের সাথে একাদশ ভাব বা ভাবপতি যুক্ত হলেই, জাতক-জাতিকা মামলাতে জয়ী হবে। (অর্থাৎ লগ্নভাব বা ভাবপতি + ষষ্ঠভাব বা ভাবপতি+সপ্তমভাব বা ভাবপতি +একাদশভাব বা ভাবপতি) = মামলা-মোকদ্দমা বা আইনগত বিবাদে জয়লাভ।

একাদশপতি যদি কেন্দ্রপতি বা ত্রিকোণপতির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত বা কেন্দ্রপতি/ ত্রিকোণপতির নক্ষত্রে থাকে, তাহলে বিজয়লাভ শুভ ইঙ্গিতবাহী। যদি গভীর ও গূঢ় বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাদশভাব পতি বা একাদশ ভাবে অবস্থিত গ্রহ কেন্দ্র প্রভাবী তাহলে, মামলাতে জয়ী ভাবটি মানসিক অথবা বৈষয়িক উভয় ক্ষেত্রেই লাভদায়ী। কিন্তু যদি একাদশভাবপতি বা একাদশ ভাবে অবস্থিত গ্রহ ত্রিকোণ প্রভাবী হয় তাহলে, মামলাতে মানসিক পরিতৃপ্তি দিলেও আর্থিক লাভ তেমনভাবে হবেনা। আবার অন্যক্ষেত্রে একাদশ ভাবগত গ্রহ বা একাদশপতির সঙ্গে যদি ৮ম, ১২শ, ৬ষ্ঠ, ৭ম ভাব বা ভাবপতি যুক্ত হয় তাহলে জয়ের উপযুক্ত পরিস্থিতি সত্ত্বেও হেরে যাবার সম্ভাবনা থাকে। এইক্ষেত্রে অষ্টম ভাব বা ভাবপতি সংযুক্ত হলে মামলা-মোকদ্দমাতে জয়ী হলেও লাভ হয় না। ষষ্ঠভাব বা বাবপতি সংযুক্ত হলে মামলা অন্যদিকে ঘুরে যাবার প্রবণতা থাকে।

মামলা-মোকদ্দমায় সৃষ্টিকারক গ্রহের দশা অর্ন্তদশা

(১) চন্দ্র মহাদশা-রাহু অন্তর্দশা-সরকারি জরিমানা, কর্ম থেকে অপসারণ ও কর্মচু্যত হওযার আশঙ্কা।

(২) মঙ্গল মহাদশা-রাহু অন্তর্দশা – রাহু ৬ষ্ঠ, ৮ম বা ১২শ থাকলে অথবা পাপদৃষ্টি হলে মামলা-মোকদ্দমা ও কারাবাস।

(৩) রাহু মহাদশা – কেতু অন্তর্দশা – দশা অধিপতি রাহু থেকে ৬ষ্ঠ, ৮ম বা ১২শে শনি অবস্থান করলে কলহ, বিবাদ, মামলা-মোকদ্দমা বা শত্রুর দ্বারা নির্যাতিত হবে।

(৪) রাহু মহাদশা-শনি অন্তর্দশা – দশা অধিপতি রাহু থেকে ৬ষ্ঠ, ৮ম বা ১২শে শনি অবস্থান করলে কলহ, বিবাদ, মামলা মোকদ্দমা বা শত্রুর দ্বারা নির্যাতিত হবে।

(৫)কেতু মহাদশা – রাহু অন্তর্দশা – রাহু জাতচক্রে ৮ম বা ১২শে অন্য পাপগ্রহ দৃষ্ট হলে রাহুর অন্তর্দশাকালে ঝগড়া-বিবাদ হয়, যা বেশী হলে মামলাও হতে পারে।

(৬) শুক্র মহাদশা- মঙ্গল অন্তর্দশা – মঙ্গল গ্রহ দশাধিপতি শুক্রের থেকে ৬ষ্ঠ বা ৮ম বা ১২শ স্থানে অবস্থিত হলে, মামলা-মোকদ্দমাতে অভিযুক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকবে।

(৭) নীচস্থ বৃহস্পতি দশা-মঙ্গল অন্তর্দশা – জাতচক্রে জন্মকালীন বৃহস্পতি নীচস্থ থাকলে সেই বৃহস্পতির মহাদশা ও মঙ্গলের অন্তর্দশাতে অহেতুক ঝামেলা, মানহানি, পুলিশি হয়রানি সংক্রান্ত সমস্যা ও আইনি বিবাদ হয়।

(৮) কেতু মহাদশা-শনি/মঙ্গল অন্তর্দশা মামলা মোকদ্দমা হবে।

মামলা-মোকদ্দমা ও অহেতুক ঝামেলা বিবাদের জন্য প্রতিকার –

(১) পঞ্চমুখী হনুমানজীকে লাড্ডু নৈবেদ্য হিসাবে দিয়ে, কর্পূরের সাথে সাতটি অখন্ডিত লবঙ্গ জ্বালিয়ে ভস্মের তিলক নিজের মাথায় লাগালে মামলা-মোকদ্দাতে সফলতা আসে ও জয়ের জন্য আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

(২)রাত্রে শোওয়ার আগে খাটের নীচে তামার পাত্রে কর্পূর মিশ্রিত জল রেখে পরদিন সকালে বাইরে রেখ দিলে / কোন ফলদায়ী বৃক্ষ/ অশ্বত্থ বৃক্ষের গোড়াতে ঢেলে দিলে (জল) অকারণ অশান্তি, ঝামেলা, বিবাদ দূরীভূত হয়।

(৩) চা ছাঁকার পরে চা পাতাগুলি না ফেলে প্যাকেটে জমিয়ে রেখে জমাদারের হাতে তুলে দিলে (একটানা ৩০ দিন) জমি সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমাতে সুফল লাভ হয়।

(৪) শত্রুর নাম সাদা কাগজের উপর লাল কালিতে লিখে কাগজটির মধ্যে অল্প ছাই ও জংপড়া পেরেক (৭টি) মুখ বন্ধ কার শিশিতে আটকে শনিবার সূর্যাস্তের পর যেকোন প্রবাহিত নদী বা জলাশয়ে ফেলে দিলে; অহেতুক গোপন শত্রুতা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

(৫) বসতবাড়ীর পূর্ব বা উত্তরপূর্বে বটগাছ থাকলে মামলা মোকদ্দমাতে সারাজীবন জড়িয়ে থাকার ইঙ্গিত দেয়, যথাশীগ্র বটগাছ কেটে ফেলা উচিত।

(৬) প্রতিদিন সকালে স্নানের পরে, দক্ষিণাবর্ত শঙ্খের জল দ্বারা হরিদ্রা গণেশকে অল্পসিদ্ধি মিশ্রিত জল দিয়ে স্নান করিয়ে সেই স্নানজল, নিজের ডান হাতের তালুতে গন্ডুষ করে নিয়ে নিম্নলিখিত মন্ত্রদ্বারা উচ্চারণ করে খেযে নিতে হবে।

মন্ত্র : ‘ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ’ (তিনবার), প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত।

(৭) প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দিরের সিঁদুর দিয়ে প্রতি অমাবস্যার রাতে শুদ্ধচিত্তে নিজের বাড়ীর দরজার উপর বাম দিকে (বাইরের দিকে) ওঁ লিখে প্রণাম করে বাড়ীর দরজার সামনে রোজ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে কালো করিষা দিতে হবে।

উপরোক্ত নিবন্ধটি প্রফেসর ডঃ কুশল সেন-এর ‘অব্যর্থ জ্যোতিষ সিদ্ধান্ত’-গ্রন্থ থেকে গৃহীত। বইটির প্রাপ্তিস্থান ঃ-

১। কমলা বুক স্টল, ৯/১এ, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলকাতা-৯, কলেজ স্ট্রীট

২। পতিত পাবন বুক স্টল, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলকাতা – ৭০০ ০০৯, ফোন-9433119599

৩। সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, ৩৮বি, বিধান সরণী, কলকাতা – ৬, ফোন। (033) 22411208

৪। মহেশ লাইব্রেরী, ২বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলকাতা – ৯, ফোন-(033)22417479

৫। স্নেহা জেমস্‌ হাউস, ২/৩৬, দমদম রোড, কলকাতা – ৭৪, ফোন – 9874694720

 566 total views,  2 views today